কারিগর- ট্যান বিডি
1,467 Views

আমি আমার ট্রেড লাইসেন্স ২০০৫ সালে পেলেও আমি লেদার ব্যবসার সাথে আরো আগে থেকেই জড়িত ছিলাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের তৃতীয়বর্ষে আমি পুরোপুরি ভাবে লেদার মার্কেটে মনোনিবেশ করার কথা ভাবি। আর সেই ভাবনা থেকেই বাজারের অবস্থা সম্পর্কে জানতে মার্কেট রিসার্চ শুরু করি। যেহেতু আমি লেদার টেকনোলজি বিষয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য অনেক সময়োপযোগী ছিল।

মার্কেট রিসার্চের মাধ্যমে আমি দেখতে পাই যে পুরুষদের মানিব্যাগ ও বেল্টের সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে মহিলাদের পণ্য যেমন-হ্যান্ডব্যাগ সবচেয়ে দামী পণ্যগুলোর একটি বিধায় চাহিদা তুলনমূলক কম। সেসময়ে, লেদার ইন্ডাস্ট্রির প্রধান লক্ষ্য মূলত ছিল রপ্তানির বাজার, তাই ভালো মানের পণ্যগুলো স্থানীয় বাজারে খুব একটা পাওয়া যেত না। সেজন্য আমি স্থানীয় বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করার লক্ষ্য নিয়েই ব্যবসায় নামি।

ব্যবসা পুরোদমে শুরু করার পূরবে আমি একটি মার্কেট সারভে করি এবং উপলব্ধি করি যে আমার জন্য সবচেয়ে উপযোগী বাজার হচ্ছে কর্পোরেট ক্লায়েন্টের। কেননা এইখানে লেদারের উপহার সামগ্রী কেনার প্রচুর গ্রাহক রয়েছে। ডাইরি কভার, ফাইল ফোল্ডার, ল্যাপটপ ব্যাগ, সবকিছুই চায়না থেকে আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। আমি তাই ৩৫০০ টাকা দিয়ে পুরোনো সিঙ্গার সেলাই মেশিন কিনে কাজ শুরু করে দেই। কিন্তু এই যাত্রায়ে আমার প্রথম যে বাঁধার মোকাবিলা করতে হয় তা হলো হাজারীবাগে নারী উদ্যোক্তার অভাব। এরপরে আরো বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন আমি ব্যবসার জন্য জায়গা খুঁজতে বের হই। কারন একজন নারি উদ্দ্যক্তাকে কেউ দোকান ভারা দিতে আস্থা পাচ্ছিল না।

দোকান ভারা না পাওয়ার ফলে আমি থেকে থাকিনি। আমি আমার পণ্যের স্যাম্পলগুলো আমার ছোট ৮০ বর্গফুট ওয়ার্ক-স্পেসেই প্রদর্শন করে কর্পোরেট কর্মীদের আকর্ষিত করার চেষ্টা করতাম। আমি হাজারীবাগের বিভিন্ন দোকানে ঘুরে সবচেয়ে ভালো বেল্ট ও মানিব্যাগ জাতীয় পণ্য খুঁজতে শুরু করলাম যেন সেসব থেকে শিখতে পারি। যখন আমি ধীরে ধীরে অর্ডার পেতে শুরু করলাম, আমি আরো কর্মী সংযোজন করি আমার ব্যবসায় এবং একটি বড় জায়গা ভাড়া করি। এরপরে আমার ব্যবসার জরুরি কাগজপত্র তৈরি করে বিভিন্ন অফিসে যেয়ে আমার পণ্যের ব্যাপারে কথা বলে আসি যেন তারা আমার সাথে কাজ করতে আগ্রহী হয়।

শুরুতে কিছু বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হলেও পরে আমি আমার পণ্যের জন্য আস্তে আস্তে ভালো প্রতিক্রিয়া পেতে শুরু করি। আমি ব্যবসার প্রথমদিন থেকেই বাজারের সবচেয়ে ভালো পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং ক্রেতারাও সেটা দেখেছেন। আমার ব্যবসায় মন্দা গেলেও আমি কখন লেদারের মান নিয়ে সমঝোতা করিনি। আমার পণ্যের গুনগত মানের কারনে আমি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকেও অনেক বড় একটা অর্ডার পাই। ২০০৮ সালে প্রথমবার আমার পণ্য যুক্তরাজ্যতে পাঠাই। ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত আমি কর্পোরেট ও রপ্তানি বাজারেই কাজ চালিয়ে যাই।

আমি ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড পাই এবং সবাই আমার উচ্চমানের লেদার পণ্য দেখে কারিগরকে ব্র্যান্ড হিসেবে তৈরি করার জন্য পরামরশ দেয়। বর্তমানে আমি আড়ং, বাটা,  এবং এপেক্সের মতো ব্র্যান্ডকে পণ্য সরবরাহ করে থাকি। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমার ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করতে পারি না। ফলে আমার ব্র্যান্ডটি প্রচারের দিক থেকে একটু পিছিয়ে পরেছে।  তবে এখন আমি আবার নতুন পরিচয় বানাতে চাই  ট্যানকে ঘিরে। ট্যান মূলত ট্যানারি বা ট্যানিং লেদার থেকে উদ্ভূত। আমার ব্র্যান্ড তৈরিতে এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে কারণ আমি বর্তমানে অনেক গুলো ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহক হিসেবে জড়িত আছি। যতদিন আমি তাদের জন্য কাজ করছি, আমি নিজের ব্র্যান্ডকে ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারব না। 

তাই আমি এখন আমার আরেকটি উদ্যোগ, ট্যানের প্রতি আর মননিবেশ করতে চাই এবং এটাকে ব্র্যান্ড হিসেবে বাজারে তুলে ধরতে চাই। এর পাশাপাশি একটা ফ্যাক্টরি কেনার পরিকল্পনা আছে কেননা বর্তমানে আমি ভাড়া জায়গায় কাজ করছি। এতদিন আমি রপ্তানির দিকে খুব বেশি মনোযোগ দেয়নি, শুধুমাত্র যখন অর্ডার পেয়েছি তখন রপ্তানি করেছি। কিন্তু এখন সে বিষয়েও আরেকটু সোচ্চার হতে চাই।