সন্দেশ মোল্ডস: প্লাবনী ইয়াসমিনের স্বপ্ন থেকে সমৃদ্ধির যাত্রা 
16 Views

লেখকঃ তাসনিয়া ইসবাত

বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে শুরু হয় সন্দেশ মোল্ডসের গল্প আসলে এক নারীর দৃঢ়তা, সৃজনশীলতা এবং সম্ভাবনার গল্প। প্লাবনী ইয়াসমিনের প্রতিষ্ঠিত এই উদ্যোগ কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি এমন এক উদাহরণ, যেখানে মাটির শিল্পকর্ম মানুষের জীবিকা, আত্মবিশ্বাস এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকে যাত্রার শুরু

প্লাবনী যখন জীবিকার পথ হিসেবে মৃৎশিল্পকে বেছে নেন, তখন অনেকেই তার সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। চাকরি খোঁজার সংগ্রামে পরাজিত প্লাবনী ২০২১ সালে একটি স্থানীয় মেলায় যান। সেখানে একটি মৃৎশিল্পের দোকান দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ছোট পরিসরে প্রথমে মৃত্তশিল্পের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ছোটবেলায় প্লাবনীর মৃতশিল্পের হাতেখড়ি হয় তার মায়ের হাত ধরে। মৃৎশিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও উৎসাহ থেকেই তার এই পেশা বেছে নেয়া।

মৃৎশিল্প যেহেতু জীবিকা নির্বাহের জন্য খুব প্রচলিত কোনো পেশা নয়, আর প্রয়োজনীয় সম্পদও সীমিত, তাই পরিবার ও আশপাশের মানুষ চাইতেন তিনি আরও নিরাপদ কোনো পেশা বেছে নিক। কিন্তু প্লাবনী শিল্প ও কারুশিল্পের প্রতি তার ভালোবাসায় অটল রইল। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে বাজারে এ ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু নকশায় বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। তাই উদ্যোগটিকে টেকসই করার স্বপ্ন নিয়ে প্লাবনী ইয়াসমিন ছোট পরিসরে তার ব্যবসা শুরু করেন এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু বছরের প্রচলিত ও বিচিত্র অনুলিপি খোঁজা শুরু করেন।

শুরুর দিকে অর্ডার পাওয়া ছিল কঠিন। তবে ধীরে ধীরে প্লাবনীর ছোট উদ্যোগটি একটি সফল ব্যবসায় পরিণত হতে শুরু করে। একবার যখন তিনি দেশজুড়ে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে অনন্য ছাঁচের নকশা সংগ্রহ করতে শুরু করেন, তখন তার প্রচেষ্টা সবার নজর নজর কেড়ে নিতে শুরু করে। প্লাবনী দক্ষ কারিগরদের নিয়ে একটি দল গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে ৪০০টিরও বেশি ভিন্নধর্মী পণ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে রয়েছে পানির জার, জগ সেট, খেলনা, টেরাকোটার দেয়াল ম্যাট এবং রান্নাঘরের বিভিন্ন সামগ্রী।

প্লাবনীর গ্রাহকদের বয়স ১৩ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে এবং তারা নিম্ন আয় থেকে উচ্চ আয়ের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। একটি ছোট ধারণা থেকে শুরু করে আজ তিনি ৩০ জনেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, যা অন্য নারীদের ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে।

চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর

প্লাবনীর যাত্রায় নতুন মোড় আসে যখন তিনি অনুলিপির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাটির পণ্যও তৈরি করতে শুরু করেন। তার কাজ প্রচারের জন্য তিনি বিভিন্ন প্রদর্শনী ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) মেলায় অংশগ্রহণ শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি নানা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে তিনি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, ব্যবসা পরিচালনা এবং ই-কমার্স সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেন।

বিশ্বব্যাংকের উইমেন এন্টারপ্রেনিয়ার্স ফাইন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (We-Fi) এর আওতায় পরিচালিত বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এবং এক্সপোর্ট রেডিনেস প্রশিক্ষণ প্লাবনীকে পরিকল্পনা দক্ষতা ও পাবলিক স্পিকিংয়ে আরও দক্ষ করে তোলে এবং তার পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে প্রস্তুত করে।

এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্লাবনী ২০২৫ সালে ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস-এ অনুষ্ঠিত বায়ার–সাপ্লায়ার সামিট-এ অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলন ২৫টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ ক্লাস্টারের ৪৬টি প্রতিষ্ঠানকে কর্পোরেট, ব্যাংক এবং বাজার নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত করেছে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিজনেস পিচ প্রতিযোগিতা, যেখানে আটজন নারী উদ্যোক্তা তাদের উদ্যোগ উপস্থাপন করেন। অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প এবং সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্লাবনী প্রথম স্থান অর্জন করেন, আরিফা আওয়াল ও জুয়েনা মিতুলের মতো অন্যান্য মেধাবী উদ্যোক্তাদের পিছনে ফেলে।

মৃৎশিল্পের বাইরেও প্রভাব

প্লাবনীর সাফল্য শুধু সংখ্যায় নয়; এর প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে বহু মানুষের জীবনে। তার উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে এবং অসংখ্য নারীকে নিজেদের স্বপ্ন অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। মাটিকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে তিনি দেখিয়েছেন যে অধ্যবসায়ের সঙ্গে স্বপ্ন যুক্ত হলে তা কীভাবে নতুন ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

আগামী দিনের স্বপ্ন

প্লাবনী তার ব্র্যান্ডকে দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করার স্বপ্ন দেখেন। তার লক্ষ্য দেশের প্রতিটি জেলায় কারখানা স্থাপন করা এবং শক্তিশালী রপ্তানি নেটওয়ার্ক তৈরি করে সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে পণ্য ও অনুলিপি পৌঁছে দেওয়া। তার স্বপ্ন, বাংলাদেশের মৃৎশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে একটি স্বীকৃত নাম হয়ে উঠুক এবং একই সঙ্গে দেশের কারিগরদের জন্য আরও কর্মসংস্থান তৈরি হোক।

অনেকের কাছে প্লাবনী ইয়াসমিন শুধু একজন উদ্যোক্তা নন; তিনি আশা, সৃজনশীলতা এবং সম্ভাবনার প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সবচেয়ে সাধারণ উপাদান দিয়েও সবচেয়ে বড় স্বপ্ন গড়ে তোলা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.