লেখক: সানজিদা ইসলাম দীপ্তি
“আমি কখনই একজন ব্যবসায়ী হতে চাইনি।”
এটি এমন একজনের অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তি, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি করে আসছেন। জুট ল্যান্ড বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অনেক আগে, প্রতীমা চক্রবর্তী নিজের জন্য একেবারেই ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন।
তবুও আজ তার পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন বাড়িতে পৌঁছে, আর বাংলাদেশে হাজার হাজার কারিগর তার ব্যবসার তৈরি করা কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের দিনাজপুরে বড় হওয়া প্রতীমা বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা সাংবাদিক হিসেবেও কল্পনা করতেন। অর্থনীতিতে এমএসএস সম্পন্ন করার পর তিনি রপ্তানি ব্যবস্থাপক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে শুরু করেন, বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরাসরি জ্ঞান অর্জন করেন। সেই সময়েই ঘটে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
শুধুমাত্র অর্ডার নেওয়ার পরিবর্তে, বেশ কয়েকজন বিদেশী ক্রেতা তাকে নিজস্ব কোম্পানি গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেন। তারা প্রতীমার মধ্যে এমন কিছু গুণ দেখেছিলেন, যা তিনি নিজে কখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করেননি। তাদের আস্থা প্রতীমার মনে একটি আশার বীজ বপন করেছিল, যা পরবর্তীতে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জুট ল্যান্ড বাংলাদেশ’-এ পরিণত হয়। প্রতীমার এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিলো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক তন্তু বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দেওয়ার, দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা এবং বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
একটি ছোট রপ্তানি উদ্যোগ হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যেখানে হাতে বোনা ব্যাগ ও ঝুড়ি থেকে শুরু করে জুট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তু থেকে তৈরি প্রিমিয়াম গৃহসজ্জা ও জীবনধারার বিভিন্ন পণ্য সবই উৎপাদিত হয়। আজ, যদিও তার কারখানায় সরাসরি প্রায় ৩০ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছে এবং বিভিন্ন উৎপাদন ক্লাস্টারে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫,০০০ কারিগর সারাবছর জুট ল্যান্ড বাংলাদেশ-এর সঙ্গে কাজ করে; তবে এই যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না।
একজন নারী হিসেবে রপ্তানি ব্যবসা শুরু করার ফলে সমালোচনা, ঈর্ষা ও প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। নিশ্চিত অর্ডার থাকা সত্ত্বেও প্রতীমা আর্থিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন। কখনো কখনো শুধু ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবুও তিনি বাধাগুলোকে নিজেকে দমে যেতে দেননি। তার ভাস্বানুসারে, “যখন দেখলাম হাজার হাজার মানুষের জীবিকা আমার কাজের সঙ্গে যুক্ত, তখন হাল ছেড়ে দেয়া কখনোই বিকল্প ছিল না,”।
কোভিড-১৯ মহামারি আবারও সেই সংকল্পকে পরীক্ষা করল। আন্তর্জাতিক অর্ডারগুলো প্রায় রাতারাতি উধাও হয়ে গেল, উৎপাদন ধীর হয়ে পড়ল, এবং আর্থিক ক্ষতি বাড়তে থাকল। কিন্তু পিছু হটার বদলে, প্রতীমা ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা এবং তাঁর উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল কারিগরদের সহায়তায় মনোনিবেশ করলেন। এই সংকট তাঁকে শিখিয়ে দিল যে উদ্যোক্তার আসল সত্তা শুধুমাত্র লাভ-লোকসানে নয়, কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালনেও পরিমাপিত হয়।
আজ, জুট ল্যান্ড বাংলাদেশ একচেটিয়াভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ। চীন ও ভারতের মতো জায়ান্টদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা এখনও চ্যালেঞ্জিং, তবুও প্রতীমা বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে রয়েছে শক্তিশালী কিছু দক্ষ কারিগর, টেকসই প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং প্রতিটি হস্তনির্মিত পণ্যে বোনা গল্প।
তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বাড়ছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন সারাবংলায় নতুন কারিগর ক্লাস্টার প্রতিষ্ঠার, একটি বৃহৎ উৎপাদন সুবিধা গড়ে তোলার, এবং একদিন টেসকো ও ওয়ালমার্টের মতো বৈশ্বিক চেইনের সরবরাহকারী হওয়ার।
প্রতীমা চক্রবর্তীর জন্য উদ্যোক্তা হওয়া কখনোই একা একটি কোম্পানি গড়ে তোলার ব্যাপার ছিল না। তিনি চেয়েছেন একটি সুযোগ সৃষ্টি করতে, যে সুযোগ আগে কখনই ছিল না, প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে বাংলাদেশি কারুশিল্প বৈশ্বিক মঞ্চে থাকার যোগ্য, এবং হাজার হাজার মানুষকে তাদের পরিস্থিতির চেয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখাতে চেয়েছেন।
সম্ভবত এ কারণেই সেই নারী, যিনি কখনো উদ্যোক্তা হতে চাননি, ঠিক সেই ধরনের উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন যা বাংলাদেশের প্রয়োজন।